পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট শেখ মুজিব নিজেই তৈরি করেছিলেন

21/12/2013 02:08

এটা স্বীকার করতেই হবে শেখ মুজিব একজন সফল সংঘটক থাকলেও কখনোই একজন সফল রাষ্ট্র নায়ক ছিলেন না। যুদ্ধ বিদ্ধস্ত একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে নিয়ে যেতে তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। তার নিজের তৈরি করা মূলনীতিই তাকে সফল হতে দেয়নি। বিশেষ করে ১৯৬৩ সালে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মারা যাবার পরে শেখ মুজিব আওয়ামীলীগের প্রধান হয়েই যে কাজটি করেন তা হচ্ছে দলের নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামীলীগ করেন। সেই সাথে আওয়ামীলীগকে একটি সেকুলার রাজনৈতিক দল হিসাবে গড়ে তুলেন।

 

এটা সত্য যে ছয় দফা দাবি মুজিবকে স্বাধীনতাকামী নির্যাতিত শোষিত জন-গোষ্ঠীর মধ্যে রাতারাতি জনপ্রিয় করে তুলেছিল। সেই সাথে ১৯৬৯ সালের ৫ই ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী’র মৃত্যু বার্ষিকীর আলোচনা সভায় মুজিব যখন ঘোষণা করলেন,

 

"There was a time when all efforts were made to erase the word "Bangla" from this land and its map. The existence of the word "Bangla" was found nowhere except in the term bay of bangle. I on behalf of Pakistan announce today that this land will be called "Bangladesh" instead of East Pakistan." [Political Profile of Bongobondhu Sheikh Mujibur Rahman]

 

তার পর থেকেই মূলত বাংলাদেশর মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। সেই সাথে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পাওয়ার পেছনে একই বছরের ১২ই নভেম্বর ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকারি জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিজড় এনজাইমের ভুমিকা পালন করেছিল। বিশেষ করে উপকূলে হাজার হাজার মানুষ মারা গেলেও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তেমন কোন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি যা নির্বাচনে তাদের ভরা ডুবির অন্যতম কারন ছিল বলে মনে করেন অনেকেই।

 

সেই সাথে এটা মনে করা হয়ে থাকে যে, ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কালো রাতের জন্ম হয়েছিল শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে। নির্বাচনের পরে পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং কোনও ইসলামপন্তি দল চাই ছিলনা মুজিব পাকিস্তানের রাষ্ট্র প্রধান হবেন। ফলে শেখ মুজিবকে পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি’র প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো’র সাথে কোয়ালিশনের অহব্বান জানানু হলে শেখ মুজিব তা প্রত্যাখান করেন। এমন একটি রাজনৈতিক পরিস্তিতিতে সাংবিধানিক ভাবে দুই পাকিস্তান এক থাকলেও বস্তুতু পূর্ব পাকিস্তান শেখ মুজিবের নির্দেশেই চলছিল। শেখ মিজিব বলে দিচ্ছিলেন কখন অফিস আদালত খুলবে, বন্ধ হবে। ৭ই মার্চের ভাষণের পর দেশ যখন উত্তাল তখনও শেখ মুজিব আলোচনার মাধ্যমে দুই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চাই ছিলেন। শেখ মুজিব কল্পনাও করেন নি যে, আলোচনার মধ্যমে সময় নষ্ট করে অপারেশন সার্চ লাইটের প্রস্তুতি নিচ্ছে হায়নারা। এখানে ২৬শে মার্চের রাতে লিখা শেখ মুজিবের একটি টেলিগ্রাফের রেফারেন্স করা যেতে পারে, "[The] Pakistan Army have suddenly attacked the Pilkhana EPR Headquarter and tha Rajarbag Police Line as well as killed many innocents in Dhaka. The battle has started in various places of Dhaka and Chittagong. I am asking help to all the nations of this world. Our freedom fighters are valiantly fighting against the foes to save their motherland. In the name of Almighty Allah my last request and order to you all is to fight for independence till death. Ask your brothers of Police, EPR, Bengal Regiment and Ansar to fight with you. No compromise, the victory is ours. Execute the last foe from our holy motherland. Carry my message to all the leaders, activists and the other patriots from the every corner of the country. May Allah bless you all. Joy Bangla." -from Shadhinota Shongrame Bangali by Aftab Ahmad

 

অতচ এই কথা গুলো বলার প্রয়োজন ছিলনা যদি তিনি ৭ই মার্চে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক চিহ্নের ঘোষণা দিতেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। কাজেই এটা মানতেই হবে তখন যদি শেখ মুজিব দুই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খায়েস ছেড়ে শুধু বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতেন তাহলে আজকের বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম লিখা হত।

 

এই টেলিগ্রাম নিয়েও কিছুটা ধূম্র জালের সৃষ্টি হয়েছে তাজ উদ্দিন আহমদ নেতা ও পিতা বইটি প্রকাশের পর! যেখানে তাজ উদ্দিন আহমদের মেয়ে অভিযোগ করেছেন মুজিব সেদিন রাতেও স্বাধীনতা ঘোষণায় অস্বীকৃতি জানিয়ে ছিলেন। এই টেলিগ্রামটি লেখা হয়েছিল মুলত তাজ উদ্দিন আহমেদ ও অন্য কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতার ইচ্ছায় এবং সাহসিকতায়! 

 

এখানে এটাও উল্লেখ করা দরকার যে শেখ মুজিবকে যখন পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের আশে পাশে একটা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হল তখন বেশির ভাগ আওয়ামীলীগ নেতা গ্রেফতার এড়াতে দেশ ছেড়ে ওয়েস্ট বেঙ্গল, আসাম এবং ত্রিপুরায় পালিয়ে গিয়েছিলেন। ইতিহাস সাক্ষিদেয় বাংলাদেশে সর্ব প্রথম পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন বামপন্তিরা। জাসদের সিরাজ সিকদারের নেত্রিত্বে সর্বহারা পার্টি প্রথম মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। অতঃপর কাদের সিদ্দিকির নেত্রিত্বে কাদেরিয়া বাহিনী এবং পরে মুক্তি বাহিনী। মুজিব বাহিনী অনেক পরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। অতচ এই দলটিই আজ মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র মালিকানা দাবি করে!

 

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রধান হয়েই যেমন মুজিব মুসলিম শব্দটি মুছে দিয়েছিলেন ঠিক তেমনি দেশ সাধিনের পরেই যখন সংবিধান তৈরির প্রয়োজন পড়ল মুজিব সেকুলারিজম কেই আদর্শ হিসাবে নিলেন। ফলে সমাজতান্ত্রিক জাসদ এবং অন্যান্য ইসলামী দোল গুলো ব্যাপারটা খুব ভাল ভাবে নিতে পারেনি। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই শেখ মুজিব আর তেমন সফলতার মুখ দেখেন নি। বিশেষ করে শেখ মুজিবের অদূরদর্শী রাষ্ট্র পরিচালনার কারনেই  ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এব্যাপারে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, Bangladeshi people feel ashamed, insulted and demoralised as a nation for this famine that was not due to a food crisis but, due instead to the lack of governance and democratic practices.

 

শেখ মুজিব ঘোষণা করেছিলেন, " I believe that the brokers, who assisted the Pakistanis during the liberation war has realized their faults. I hope they will involve themselves in the development of the country forgetting all their misdeeds. Those who were arrested and jailed in the Collaborator act should be freed before the 16 December 1974."  তার এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা সাময়িক সফলতা হলেও এই সিদ্ধান্তটি দীর্ঘ মেয়াদী সমস্যার সৃষ্টি করেছে। যা এখনও জাতিকে দ্বিবিভক্ত করে রেখেছে। তাছাড়া ১৯৭৪ সালে মুজিব OIC’র সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোর গিয়ে বাঙ্গালীর রক্তের শত্রুদের বুকে জড়িয়ে নেয়া কিংবা হাতে চুমু খাওয়া লাখ শহিদের রক্তের সাথে প্রতারণার সামিল ছিল। সামিল ছিল এ কারনেই যে পাকিস্তান তখনও অনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশর কাছে ক্ষমা চায়নি।

 

শেখ মুজিবের সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ইতিহাসে বাকশাল বা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ গঠন ছিল একটি আত্মগাতি সিদ্ধান্ত। ১৯৭৫ সালের ৭ই জুন মুজিব সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে মূলত বাকশাল গঠন করে শেখ মুজিব তাই করেছিলেন যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে বাঙ্গালিরা মুক্তি যুদ্ধ করেছিল। আলাদা হয়েছিল পাকিস্তান থেকে!  শুধু তাই নয় শেখ মুজিব রাষ্ট্র পরিচালনায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবারিকরন করেছিলেন। যা অনেকেই সহজ ভাবে নেয়নি। এখানে অফ টপিক একটা কথা বলে নেয়া ভাল যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামীলীগ এমন একটা রাজনৈতিক দল যারা নিজেদের বিরুদ্ধে যে কোন ধরনের আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করে। সেটা শেখ মুজিবই শুরু করেছিলেন। বাকশালের বিরুদ্ধে যখন বাংলাদেশের সাধারণ জনগন বিশেষ করে জাসদ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল আন্দোলন শুরু করল শেখ মুজিব তখন রক্ষী বাহিনী তৈরি করে তা দমনের চেষ্টা করলেন। তাতে তিনি সাময়িক সফল হয়েছিলেন বলা যায়। ধারনা করা হয় রক্ষী বাহিনী দিয়ে মুজিব প্রায় চল্লিশ হাজার বাঙ্গালী নিধন করেছিলেন। যাদের বেশির ভাগই ছিল জাসদের নেতা কর্মী। সিরাজ সিকদারকেও তার নির্দেশেই হত্যা করা হয়। শেখ মুজিব সংসদে দাঁড়িয়ে দাম্বিকতায় বলে ছিলেন কোথায় আজ সিরাজ সিকদার! শুধু তাই নয়, মূলত ৭৪ এর দুর্ভিক্ষে যখন প্রায় ৭০ হাজার বাঙ্গালী মৃত্যু বরন করল তার পর থেকেই মুজিব জনগন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিলেন। ফলে ক্ষমতায় ঠিকে থাকার জন্যেই তিনি অসততার আশ্রয় নিয়ে অন্য সকল রাজনৈতিক দল এবং গণমাধ্যমের মুখে থালা ঝুলিয়ে ছিলেন।

 

যে গণতন্ত্র সুশাসন এবং শান্তির জন্যে মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল বাকশাল গঠন করে মুজিব সেই পথ রুদ্ধ করে দিয়ে ছিলেন। শেখ মুজিবের হাত ধরেই মূলত বাংলাদেশে সর্ব প্রথম গণতন্ত্র ভূপতিত হয়ে ছিল। সেই সাথে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার কারনে শেখ মুজিব নিজের ঘরে শত্রু নিয়ে বাস করছিলেন। খন্দকার মুশ্‌তাক আহমদকে তিনিই তৈরি করেছিলেন। কিন্তু মুশ্‌তাক ভিতরে ভিতরে মুজিবের সেকুলারিজম, সোশ্যালিজম এবং ভারত প্রীতি সহজে মেনে নিতে পারেননি।

 

এসকল ঘটনা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় শেখ মুজিব নিজের হাতেই ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন। ফলে ধারনা করা হয় মুজিব সপরিবারে হত্যার পেছনে সেনা অভুত্যান না যতটা দায়ী ছিল তার চেয়ে বেশি দায়ী ছিলেন শেখ মুজিব নিজে!